Home » অন্য কথা, প্রধান খবর, সুরের ধ্বনি » বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস

বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস

Shah abdul karimগানে গানে পিরিতি এতোটাই বাড়িয়ে গেলেন যে, তার অনুপস্থিতি আজও আমাদের ভারাক্রান্ত করে। আজ ১২ সেপ্টেম্বর, ছয় বছর আগের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। এই যে চলে যাওয়া এ অমোঘ নিয়তি, যেতেই হবে। তবে যারা কীর্তিমান পুরুষ তারা যাওয়ার আগে ছাপ রেখে যান। সেখানে থাকে অজস্র মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এমনকি দুঃখবোধ।

হাওরবেষ্টিত ভাটি বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম ‘উজান ধল’। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার এই গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মরমী সাধক বাউল শাহ্ আব্দুল করিম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির মধ্যে দূরে বহুদূরে ছিটেফোঁটার মতো দু’চারটি গ্রাম। হওরাঞ্চলে বছরের অর্ধেক সময় কোনো কাজ থাকে না। দারিদ্র্য সেখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। ছোটবেলা থেকেই সেই দারিদ্র্য সঙ্গী করে আব্দুল করিমের বেড়ে ওঠা। পেটের দায়ে কৃষি কাজে শ্রম দিয়েছেন অন্যের জমিতে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালনী নদী। হাওর আর কালনীর ঢেউ এবং হেমন্তে হাওরের বুকে সবুজ ফসলের দোলা তাকে উদাসী করে তোলে। কখনও হাতছাড়া করেননি প্রিয় একতারা; জীবদ্দশায় এটি ছিল নিত্যসঙ্গী।

জীবনের শুরু থেকেই আব্দুল করিম ভাবনা ও আবেগ গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চাইতেন। এটিই ছিল তার প্রথম ভালোলাগা। সেই ভালোলাগার স্রোত ওই কালনীর ঢেউয়ের মতোই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। এরপর পরিচয় শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বক্সের সঙ্গে। এই আধ্যাত্মিক বাউল সাধকের নিকট তিনি দীক্ষা নেন। এ ছাড়াও তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন ওস্তাদ করম উদ্দীন ও রশিদ উদ্দীনের। এরা দুজনই বাউল সাধক।

যে হাওরের নিলুয়া বাতাস তাকে করে তুলেছিল বাউল, সেই বাতাসে আলিঙ্গন করে নিজ বসত বাড়ির উঠানে চিরনিদ্রায় রয়েছেন আব্দুল করিম। পাশেই শুয়ে আছেন প্রিয়তমা স্ত্রী সরলা বিবি। ‘সরল তুমি শান্ত তুমি নূরের পুতুলা, সরল জানিয়া নাম রাখি সরলা’, এক সময়ের মনজান বিবি প্রিয়তম স্বামীর এমন গানের মধ্য দিয়ে হয়ে যান সরলা বিবি। যিনি নিজেও সাধক ছিলেন। স্বামীর বাউল সম্রাট হয়ে ওঠার পেছনে তার অবদান ও অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি। মূলত ২০০১ সালে দেশের সর্বোচ্চ খেতাব একুশে পদক প্রাপ্তির পরই আব্দুল করিম প্রচারে আসেন। তখন তার বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই, অর্থাৎ অথর্ব বৃদ্ধ। ঠিক মতো চলতে, বলতে এমনকি শুনতেও পান না। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি বহু সম্মাননা পেয়েছেন। যদি উপযুক্ত সময়ে এই সম্মাননা পেতেন, উৎসাহ আর উদ্দীপনায় হয়তো আমাদের আরও অনেক দিয়ে যেতে পারতেন। খুব আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন, আব্দুল করিমের একমাত্র সন্তান বাউল শাহ্ নূর জালাল। কিন্তু এ দেশে বাস্তবতা হলো, গুণীর স্বীকৃতি মেলে অসময়ে অথবা মৃত্যুর পরে।

প্রচলিত এই সমাজ আব্দুল করিমকে একাধিকবার বিতাড়িত করেছে, সমাজচ্যুত করেছে। দেখা গেছে কখনও কখনও এই সমাজ তাকে পুনরায় ফিরিয়েও নিয়েছে। রাতব্যাপী ওয়াজ মাহফিলের নামে গালিগালাজ করে তাকে কাফের, মুরতাদ বলে তার বিরুদ্ধে অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঈদের নামাজের খুতবাতেও তার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, জনৈক শিষ্যের মৃত্যু হলে তিনি গ্রামের মসজিদের মওলানাকে জানাজা পড়াতে বললে, মওলানা এক কথায় অস্বীকার করে বলেছিলেন, কাফের মুরতাদের জানাজা পড়া মুসলমানের জন্য হারাম। অবশেষে অনেক অনুনয় বিনয়ের পর শর্তজুড়ে দিয়ে বলা হয়েছিল, যদি তওবা পড়ে এই সব গানবাজনার বেদাতী কায়কারবার চিরতরে বন্ধ করে দাও তাহলেই কেবল জানাজা পড়ানো যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতেও আব্দুল করিম সে শর্ত প্রত্যাখ্যান করার মতো সৎ সাহস দেখাতে পেরেছিলেন।অথচ বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে সমাজ তাকে ঘৃণা করতো, অবহেলা করতো, আজ সেই সমাজের লোকেরাই গর্ব করে বলে, বাউল শাহ্ আব্দুল করিম এই হাওরের সন্তান, আমাদের গ্রামের সন্তান।

তার গান গেয়ে বর্তমানে অনেকেই নিজের নাম তথাকথিত বড় শিল্পীর কাতারে লিখিয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সাক্ষাতকারে তাদের মুখে আব্দুল করিমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ফুলঝুড়ি শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে জীবদ্দশায় আব্দুল করিম এদের কারও কাছে কোনো প্রকার সহায়তা তো দূরের কথা কৃতজ্ঞতা পর্যন্ত পাননি। আবার কেউ কেউ তাকে ব্যবহার করে নিজেকে শিল্প সাহিত্যের বৃহৎ সমঝদারের আসনে বসাবার প্রয়াস পেয়েছেন। এ সব কিছুর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল ওই একটাই- তা হলো অর্থের মোহ এবং সস্তা যশ খ্যাতির প্রত্যাশা। ছেলে নূর জালালের কথায় এমনও জানা যায়, দেশের বরেণ্য এক কথাসাহিত্যিক কোনো এক অনুষ্ঠানে আব্দুল করিমকে সম্মানের সঙ্গে যত্ন করে ঢাকা নিয়ে আসেন। রাতভর সেখানে অনুষ্ঠান হয়। আব্দুল করিম সেখানে গান পরিবেশন করেন। কাজ শেষে সেই সাহিত্যিক আব্দুল করিমের সঙ্গে দেখা না করে, অন্যের হাতে কিছু টাকা পাঠিয়ে বিদায় করে দেন। মৃত্যুর আগেও এই অবহেলার দুঃখ তিনি ভুলতে পারেননি।

বহুজাতিক ফোন কোম্পানিগুলো এ দেশের মানুষের আবেগ, অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার সবচেয়ে বড় ঠিকাদারে পরিণত হয়েছে। করিমের গানেও ছিল তাদের নজর। সে গান তারা যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। দেশের কপিরাইট বিধান মোতাবেক তার পরিবারের রয়ালটি পাওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা পাননি। শুধু তাই নয়, তারা আজ করিমের কবর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কবরের পাশেই চোখে পড়ে তাদের বিজ্ঞাপন। অথচ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর আশ্চর্য রকমের নির্বিকার। আব্দুল করিম কিন্তু জীবদ্দশাতেই আঁচ করতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতে তাকে নিয়ে কী ঘটবে। পরিচিতজনদের কাছে আক্ষেপ করে সেকথা তিনি বলেও গেছেন, ‘মরার পর আমার হাড়-হাড্ডি নিয়েও ব্যবসা চলবে।’

বাউল শাহ্ আব্দুল করিম রচিত গানের ছয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে (কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর কোলে ও ভাটির চিঠি)। সিলেট শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান ছিলেন করিমের একান্ত ভক্ত। তিনিই তার লেখা গানের খাতা পৌঁছে দেন বাংলা একাডেমির শামসুজ্জামান খানের কাছে। মূলত এই হান্নানই বাউল করিমকে আবিষ্কার করে তুলে আনেন আজকের এই বৃহৎ পরিমণ্ডলে।

আব্দুল করিম অসংখ্য গান লিখে গেছেন। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার গান এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা গেছে। বর্তমানে অনেক শিল্পীকে বিভিন্নভাবে মূল সুরের বিকৃতি ঘটিয়ে করিমের গান গাইতে দেখা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রবণতাটি কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, গানের গীত পর্যন্ত ইচ্ছেমতো এদিক-সেদিক করে ফেলা হচ্ছে। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা তিনি জীবদ্দশাতেই দেখে গেছেন আর নীরবে চোখের জল ফেলেছেন। এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে কাছেন মানুষদের বলেছেন, ‘আমি যেহেতু গানের স্বরলিপি প্রণয়ন করে যেতে পারলাম না, তাই সুরের খানিকটা এদিক সেদিক হলে আপত্তি নেই কিন্তু মূল গীত যেন ঠিক রাখা হয়।’

সম্প্রতি বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের গানের গীত ও সুর সংগ্রহে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নূর জালালের পাশাপাশি এ কাজে সহযোগিতা করছেন তার বাবার সঙ্গে সঙ্গ করেছেন এমন বেশ কয়েকজন বাউল শিল্পী। পাশাপাশি গানগুলোর স্বরলিপি প্রণয়নেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন দেশের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের গান নিয়ে কাজ করছে। উজান ধল গ্রামে বছরে দুইবার লোক উৎসব পালিত হয়। একটি ১২ সেপ্টেম্বর আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে, অন্যটি পৌষ মাসের প্রথম শুক্রবার সরলা বিবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে। সে অনুযায়ী ধারণা করতে কষ্ট হয় না আজ কালনীর পাড় ভরে উঠবে আব্দুল করিমের ভক্ত, বাউল সাধকদের পদচারণায়। উজান ধলের বাতাসে ভাসতে থাকবে করিমের গানের সুর। কান পাতলেই শোনা যাবে সেই গান।

Referral Banners

Short URL: http://www.binodonnews.com/?p=9736

Comments are closed

ছবির ঝলক

0119317
Visit Today : 27
Visit Yesterday : 50
Total Visit : 119317
Hits Today : 82
Total Hits : 740934
Who's Online : 2

facebook